"ফাউল কলেরা একটি অতি তীব্র ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ। এটি মুরগির রক্তে বিষক্রিয়া তৈরি করে এবং হঠাৎ করে কোনো লক্ষণ ছাড়াই সুস্থ মুরগি মারা যেতে পারে।"
পোল্ট্রি খামারে হঠাৎ মড়ক লাগার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফাউল কলেরা। এটি 'পাস্তুরেলা মাল্টোসিডা' (Pasteurella multocida) নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এটি সব বয়সের মুরগির হতে পারে, তবে পূর্ণবয়স্ক বা বড় মুরগির ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা বেশি দেখা যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এই রোগে খামারের ৫০-৭০% মুরগি মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফাউল কলেরা ব্যাকটেরিয়াটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এর বিস্তারের কারণগুলো হলো:
বন্য প্রাণী ও ইঁদুর: খামারে ইঁদুর বা বন্য পাখির আনাগোনা থাকলে তাদের বিষ্ঠা বা লালার মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।
দূষিত পানি ও খাদ্য: খামারের খাবার বা পানি যদি কোনোভাবে আক্রান্ত মুরগির সংস্পর্শে আসে।
মৃত মুরগির দেহ: খামারে মৃত মুরগি ফেলে রাখলে বা ঠিকমতো মাটিচাপা না দিলে সেখান থেকে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়।
জৈব নিরাপত্তার অভাব: খামারে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়মিত জীবাণুমুক্ত না করা।
এই রোগটি দুই ভাবে দেখা দিতে পারে—তীব্র (Acute) এবং দীর্ঘস্থায়ী (Chronic)।
১. তীব্র ফাউল কলেরার লক্ষণ:
মুরগি কোনো লক্ষণ ছাড়াই হঠাৎ মারা যায়। অনেক সময় রাতে সুস্থ মুরগি দেখে আসলেন, সকালে গিয়ে দেখলেন মারা পড়ে আছে।
মুরগির ঝুঁটি এবং কানের লতি কালচে বা নীলচে রঙ ধারণ করে (সায়ানোসিস)।
মুরগির নাক ও মুখ দিয়ে ফেনা বা শ্লেষ্মা বের হতে পারে।
২. দীর্ঘস্থায়ী বা সাধারণ লক্ষণ:
মুরগির ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হয়, যা সাধারণত হলুদাভ বা সবুজ রঙের হয়ে থাকে।
মুরগির জয়েন্ট বা পায়ের গিঁট ফুলে যায়, যার ফলে মুরগি খুঁড়িয়ে হাঁটে।
খাবারের প্রতি তীব্র অনীহা দেখা দেয় এবং মুরগি খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
যেহেতু এটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ, তাই সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক সময়মতো দিতে পারলে মুরগি বাঁচানো সম্ভব:
অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা: সালফোনামাইড (Sulfonamides), অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (Oxytetracycline) বা এনরোফ্লক্সাসিন জাতীয় ঔষধ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ব্যবহার করতে হবে।
খাবার ও পানি: দ্রুত খাবার ও পানির পাত্র জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং আক্রান্ত মুরগিকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে।
ইলেক্ট্রোলাইট: মুরগির ধকল কমাতে পানির সাথে স্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট পাউডার দেওয়া যেতে পারে।
ইঁদুর ও বন্যপাখি নিয়ন্ত্রণ: খামারকে সম্পূর্ণ ইঁদুরমুক্ত রাখতে হবে।
মৃত মুরগি অপসারণ: মৃত মুরগি কখনোই খোলা জায়গায় ফেলবেন না, গভীর গর্ত করে মাটিচাপা দিন।
ভ্যাকসিন বা টিকা: ফাউল কলেরার জন্য সরকারি ও বেসরকারি কার্যকর ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। সাধারণত ২ মাস বয়সে এই টিকা দিতে হয়।
জৈব নিরাপত্তা: খামারের চারপাশে নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে করুন।
ফাউল কলেরা খামারের জন্য একটি অভিশাপের মতো। তবে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখলে এই রোগ থেকে খামারকে রক্ষা করা সম্ভব। মুরগির ঝুঁটি কালো হয়ে যাওয়া বা হঠাৎ মৃত্যুর লক্ষণ দেখলেই দ্রুত অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
যেকোনো ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি সার্জন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খামারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আপনার খামারে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।