"গামবোরো পোল্ট্রির একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ যা মুরগির 'বার্সা' বা রোগ প্রতিরোধকারী অঙ্গকে আক্রমণ করে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি খামারের বিশাল অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে।"
গামবোরো বা ইনফেকশাস বার্সাল ডিজিজ (IBD) পোল্ট্রি শিল্পের জন্য একটি বড় হুমকি। এটি সাধারণত ১০ থেকে ৪০ দিন বয়সী মুরগির বাচ্চাদের আক্রমণ করে। এই ভাইরাসের বিশেষত্ব হলো এটি মুরগির শরীরে রোগ প্রতিরোধের প্রধান কেন্দ্র 'বার্সা'কে অকেজো করে দেয়, ফলে মুরগি অন্য যেকোনো ছোটখাটো রোগেও মারা যেতে শুরু করে।
গামবোরো রোগ 'বিরনা ভাইরাস' (Birnavirus) নামক এক প্রকার অতি শক্তিশালী ভাইরাসের কারণে হয়। এর বিস্তারের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো:
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ: খামারের লিটার (তুষ) যদি দীর্ঘক্ষণ ভেজা থাকে তবে সেখানে ভাইরাস দ্রুত বংশবিস্তার করে।
সরঞ্জাম ও জুতা: আক্রান্ত খামারের ব্যবহৃত খাঁচা, পাত্র বা খামারিদের জুতার মাধ্যমে এই ভাইরাস এক খামার থেকে অন্য খামারে ছড়ায়।
পানি ও খাদ্য: ভাইরাসে দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এটি সুস্থ মুরগির শরীরে প্রবেশ করে।
দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাস: এই ভাইরাসটি এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ অনেক জীবাণুনাশকেও এটি মরে না এবং খামারে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
খামারে গামবোরো দেখা দিলে মুরগির মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়:
১. বাহ্যিক লক্ষণ:
মুরগি হঠাৎ করে ঝিমাতে শুরু করবে এবং এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকবে।
মুরগির পালক উসকো-খুসকো হয়ে যায় এবং ডানা ঝুলে পড়ে।
মুরগি তার নিজের মলদ্বারের বা পেছনের দিকে বারবার ঠোকরাতে থাকে।
২. মলত্যাগের পরিবর্তন:
মুরগি পাতলা এবং সাদা চুনা পায়খানা করে।
পায়খানার সাথে অনেক সময় হালকা আমাশয়ের মতো দেখা যেতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ বা পোস্টমর্টেম লক্ষণ:
মুরগির বুকের ও পায়ের মাংসে রক্তের ছোপ বা লাল দাগ দেখা যায়।
মুরগির বার্সা (লেজের কাছে অবস্থিত ছোট থলি) ফুলে বড় হয়ে যায় এবং তাতে রক্ত বা পুঁজ জমে।
রানীক্ষেতের মতো গামবোরোও একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এরও সরাসরি কোনো ঔষধ নেই। তবে নিচের পদক্ষেপগুলো মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করবে:
পানির ব্যবস্থাপনা: মুরগিকে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ, ইলেকট্রোলাইট এবং ভিটামিন-সি মিশ্রিত পানি দিতে হবে যাতে পানিশূন্যতা না হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক: সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন রোধে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শে হালকা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।
লিটার পরিবর্তন: আক্রান্ত মুরগির লিটার বা তুষ দ্রুত সরিয়ে নতুন তুষ দিতে হবে এবং জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।
প্রোটিন কমানো: গামবোরো আক্রান্ত হলে কিডনির ওপর চাপ কমাতে খাবারের প্রোটিনের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গামবোরো থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকরী উপায় হলো সঠিক সময়ে টিকা বা ভ্যাকসিন প্রদান। হিমি এগ্রোর পরামর্শ অনুযায়ী নিচের শিডিউল ফলো করুন:
১০-১২ দিন বয়সে: গামবোরো ইন্টারমিডিয়েট (Gumboro Intermediate) - খাবার পানির সাথে।
১৭-১৯ দিন বয়সে: গামবোরো বুস্টার ডোজ (Gumboro Booster) - এটি দ্বিতীয়বার দিলে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
গামবোরো রোগ খামারিদের জন্য আতঙ্কের কারণ হলেও উন্নত বায়ো-সিকিউরিটি এবং সঠিক ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখবেন, একবার গামবোরো আক্রান্ত হলে মুরগির গ্রোথ অনেক কমে যায়, তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধেই বেশি গুরুত্ব দিন।
যেকোনো ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি সার্জন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খামারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আপনার খামারে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।