"রানীক্ষেত পোল্ট্রির একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত মহামারি। এটি মূলত মুরগির শ্বসনতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে, যার ফলে খামারে ১০০% পর্যন্ত মৃত্যুহার হতে পারে।"
রানীক্ষেত বা নিউক্যাসল ডিজিজ (Newcastle Disease) হলো এভিয়ান প্যারামিক্সোভাইরাস টাইপ-১ এর কারণে সৃষ্ট একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। ১৯২৬ সালে ভারতের রানীক্ষেত এলাকায় প্রথম শনাক্ত হওয়ায় এটি দক্ষিণ এশিয়ায় এই নামেই পরিচিত। এটি শুধু আপনার খামারের মুরগি নয়, বরং আপনার পুরো বিনিয়োগকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এই রোগের মূল কারণ হলো ভাইরাসের সংক্রমণ। এটি সাধারণত নিচের মাধ্যমগুলোতে ছড়ায়:
বায়ু প্রবাহ: আক্রান্ত খামার থেকে বাতাসের মাধ্যমে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে।
দূষিত পানি ও খাবার: আক্রান্ত মুরগির লালা বা বিষ্ঠা যদি খাবার বা পানির সাথে মিশে যায়।
মানুষ ও সরঞ্জাম: খামারে আসা দর্শনার্থী, ব্যবহৃত খাঁচা, বা জুতার মাধ্যমে ভাইরাস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়।
বন্য পাখি: চড়ুই বা শালিক জাতীয় পাখি এই ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে।
রানীক্ষেত রোগের লক্ষণগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. শ্বসনতন্ত্রের লক্ষণ:
মুরগি হা করে নিঃশ্বাস নেয় এবং ঘড় ঘড় শব্দ করে।
মুখ দিয়ে লালা ঝরতে দেখা যায়।
২. পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণ:
মুরগি পাতলা পায়খানা করে, যা সাধারণত সবুজাভ বা সাদা চুনের মতো হয়।
খাবারের প্রতি অনীহা এবং প্রচুর পানি পান করা।
৩. স্নায়বিক লক্ষণ:
মুরগির ঘাড় বাঁকা হয়ে যাওয়া (Torticollis)।
ডানা ঝুলে পড়া এবং পা অবশ হয়ে যাওয়া।
মুরগি গোল হয়ে ঘুরতে থাকা।
যেহেতু এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই আক্রান্ত হওয়ার পর সরাসরি কোনো অ্যান্টিবায়োটিক একে সারাতে পারে না। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
আইসোলেশন: আক্রান্ত মুরগিকে সাথে সাথে সুস্থ মুরগি থেকে আলাদা করতে হবে।
বায়ো-সিকিউরিটি: পুরো খামারকে জীবাণুমুক্ত করতে হবে (যেমন- পটাশ বা ল্যাপল মিশ্রিত পানি স্প্রে করা)।
সহায়ক চিকিৎসা: ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে মুরগিকে মাল্টি-ভিটামিন, ইলেকট্রোলাইট এবং ইমিউন বুস্টার দিতে হবে। সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন রোধে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।
রানীক্ষেত থেকে বাঁচতে ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্প নেই। হিমি এগ্রো খামারিদের জন্য নিচের শিডিউলটি অনুসরণ করার পরামর্শ দেয়:
৩-৫ দিন বয়সে: বিসিআরডিভি (BCRDV) - চোখের ফোঁটা।
২১ দিন বয়সে: বিসিআরডিভি (BCRDV) - বুস্টার ডোজ।
৬০ দিন বা তার বেশি বয়সে: আরডিভি (RDV) - মাংসে ইনজেকশন।
রানীক্ষেত রোগ মানেই খামারের মড়ক নয়, যদি আপনি সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন নিশ্চিত করেন এবং জৈব নিরাপত্তা মেনে চলেন। আপনার এলাকায় বা খামারে এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অভিজ্ঞ পোল্ট্রি কনসালটেন্টের পরামর্শ নিন।
যেকোনো ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি সার্জন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খামারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আপনার খামারে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।