"মারেক্স পোল্ট্রির একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত ক্যান্সার জাতীয় রোগ। এতে মুরগির স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে পা বা ডানা অবশ হয়ে যায় এবং মুরগি পঙ্গু হয়ে মারা যায়।"
মারেক্স ডিজিজ হলো এক প্রকার হারপিস ভাইরাসজনিত রোগ যা মুরগির শরীরে টিউমার তৈরি করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি পোল্ট্রি শিল্পের জন্য একটি নীরব ঘাতক কারণ এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। সাধারণত ৬ থেকে ৩০ সপ্তাহ বয়সী মুরগিতে এই রোগ বেশি দেখা যায়, তবে সংক্রমণের শুরু হয় মূলত হ্যাচারিতে বা ব্রুডিংয়ের প্রথম কয়েক দিনে।
মারেক্স রোগের ভাইরাসটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়:
পালকের খুশকি ও ধুলো: আক্রান্ত মুরগির পালকের গোড়া থেকে ঝরে পড়া খুশকি বা ডাস্টের মাধ্যমে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়ায়। সুস্থ মুরগি শ্বাস নেওয়ার সময় এই ভাইরাস শরীরে গ্রহণ করে।
দূষিত পরিবেশ: এই ভাইরাস খামারের দেয়ালে বা মেঝেতে কয়েক মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
জৈব নিরাপত্তার অভাব: আক্রান্ত খামার থেকে সরঞ্জাম বা জুতার মাধ্যমে অন্য খামারে এটি ছড়াতে পারে।
বয়স: মুরগির বয়স যত কম থাকে, তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে তত বেশি থাকে।
মারেক্স আক্রান্ত মুরগি চেনা বেশ সহজ কারণ এর লক্ষণগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট:
পা অবশ হওয়া (Paralysis): মুরগির এক পা সামনে এবং এক পা পেছনে দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে থাকে (একে স্প্লিট লেগ বা স্প্লিট পোজ বলে)।
ডানা ঝুলে পড়া: মুরগি তার ডানা শরীরের সাথে আটকে রাখতে পারে না, ডানা নিচে ঝুলে থাকে।
ঘাড় বেঁকে যাওয়া: অনেক সময় মুরগির ঘাড় একদিকে হেলে যায় বা বেঁকে যায়।
চোখের পরিবর্তন (Grey Eye): মুরগির চোখের মণি ধূসর হয়ে যায় এবং চোখের আকৃতি আঁকাবাঁকা হয়ে যেতে পারে, ফলে মুরগি অন্ধ হয়ে যায়।
ওজন কমে যাওয়া: মুরগি খাবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না বলে দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং মারা যায়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মারেক্স রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। ভাইরাসটি একবার শরীরে প্রবেশ করলে এবং লক্ষণ দেখা দিলে মুরগিকে সুস্থ করা সম্ভব হয় না। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিচের কাজগুলো করা হয়:
আলাদা করা: লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই আক্রান্ত মুরগিকে খামার থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
সহায়ক সেবা: পঙ্গু মুরগি যদি দামী ব্রিড হয়, তবে তাকে আলাদা রেখে হাতে খাবার ও পানি খাওয়ালে কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারে, তবে এটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়।
গভীর পরিষ্কার: লট শেষ হওয়ার পর পুরো খামার ফরমালিন বা শক্তিশালী জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
প্রতিরোধই মারেক্স থেকে বাঁচার একমাত্র পথ:
হ্যাচারিতে ভ্যাকসিন: মারেক্সের টিকা সাধারণত বাচ্চা ফোটার পরপরই (Day 0) হ্যাচারিতে দেওয়া হয়। বাচ্চা কেনার সময় নিশ্চিত হোন যে তাদের মারেক্স ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে কি না।
বায়ো-সিকিউরিটি: প্রথম ২-৩ সপ্তাহ বাচ্চাদের বাইরের বাতাস বা বড় মুরগির সংস্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখুন।
সুষম পুষ্টি: উন্নত মানের ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার মুরগির ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে।
মারেক্স রোগ খামারের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ। একবার এই ভাইরাস খামারে সেট হয়ে গেলে তা দূর করা কঠিন। তাই বাচ্চা কেনার সময় ভ্যাকসিনের ব্যাপারে আপস করবেন না এবং জৈব নিরাপত্তা কঠোরভাবে মেনে চলুন।
যেকোনো ঔষধ প্রয়োগের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি সার্জন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খামারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আপনার খামারে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।